সাহিত্য

গল্প “কমলিনীর কথা”

কবিতার পর এবার গল্প। এই সময়ের বাংলা ছোটগল্পে একটি উল্লেখযোগ্য নাম গোপাল মিস্ত্রি। নানা পত্রপত্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিখছেন। দু’টি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। জটিলতাহীন গদ্য আর জীবনের প্রতি নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর গল্পের প্রাণভোমরা। এক অসম্ভব টান থাকে তাঁর গল্পে। জীবনের ছোট ছোট পাওয়া না-পাওয়া, সম্পর্ক, বিচিত্র যাপনচিত্র আর মনস্তাত্ত্বিকতার বিপজ্জনক বাঁক ধরে হেঁটে যায় তাঁর অবিকল্প কথনভঙ্গিটি! হে পাঠক, আপনিও হাঁটা শুরু করুন! Image Source:Google

কমলিনীর কথা

গোপাল মিস্ত্রি :- ভদ্রলোককে কেউ চেনে না। কারও চেনার কথাও নয়। এবাড়ির কেউ তাকে এর আগে কোনওদিন দেখেনি। কারও কাছে তাঁর কথা কেউ কোনওদিন শোনেওনি। একেবারে অচেনা এমন একজনকে এত বেলায় বাড়িতে নিয়ে আসায় সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল দীপুর ওপর। ভদ্রলোক বাইরের ঘরে বসে, ভেতরে রান্নাঘরে ফুঁসে উঠল ঊর্মিলা, তোমার আক্কেল বলে কিছু নেই? চেনো না, জানো না অমনি একটা লোক কী বলল তাতেই বিশ্বাস করে তাকে বাড়িতে নিয়ে চলে এলে? আজকাল কত রকমের লোক কত ফন্দি ফিকির করে বাড়িতে ঢুকে পড়ে শোনো না?
দীপু বোঝানোর চেষ্টা করল, উনি তো বড় মামার কথাই বললেন। তাহলে অবিশ্বাসের কী আছে?
-অবিশ্বাসের কিছু নেই? তুমি কি কোনওদিন ওনাকে দেখেছ? না তোমার মামাদের মুখে কোনওদিন ওনার কথা শুনেছ? তোমার মামাদের সেই বাড়িই তুমি দেখনি, সে গ্রামে যাওনি, অথচ মামার নাম করে সেখানকার কে কী বলল অমনি তুমি বিশ্বাস করে ফেললে?
চাপা গলায় দীপু বলে, তুমি চুপ কর। এসে পড়েছেন এখন কী করে তাকে বলব, মামাদের দেশ দেখিনি তো আপনাকে কী করে চিনব? আর তাছাড়া উনি তো বললেন, আমাদের এই বাড়িতেও উনি এসেছেন, আমার জন্মের আগে।
-অমনি তুমি গলে গেলে। এখন তার জন্য সব ব্যবস্থা কর। হয়তো রাতেও উনি এখানে থাকবেন। কিংবা আরও দু’চারদিন গেঁড়ে বসে থাকবেন। একটা অচেনা লোককে বাড়িতে থাকতে দিতে হবে।

-আরে উনি বয়স্ক মানুষ। অসুবিধার কী আছে?
-তোমার তো কোনও অসুবিধা নেই। সব ঝামেলা তো পোহাতে হবে আমাকে। তোমার বিছানা ধরা মায়ের সেবা কর, তার হাগুমুতু সব পরিষ্কার কর। তার ওপর বাইরের উটকো ঝামেলা পোয়াও। আবার নতুন করে ওনার জন্য রান্না চাপাও। তোমার আর কী!
-প্লিজ ঊর্মি, একটা বেলা তো। উনি নিশ্চয় বিকেলে চলে যাবেন।
-তোমাকে কি উনি বলেছেন বিকেলে চলে যাবেন? অত দূর থেকে এসেছেন বলছেন, আর এসেই চলে যাবেন? বলিহারি তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি। এসব লোক যাবার নয়। যারা খবর না দিয়ে লতায় পাতায় সম্পর্কের ধুয়ো তুলে অচেনা বাড়িতে এসে হাজির হতে পারে তারা দু’চারদিনের আগে নড়বার পাত্র নয়। তারপর অন্য আর একটা দেশ থেকে এসেছেন। হয়তো বলেই বসলেন, এখানেই তোমাদের কাছে থাকব। এদের কখনও বিশ্বাস করতে আছে?
-না গেলে থাকবেন দু’দিন। তুমি এবার থামো তো।’ রেগে উঠল দীপু। তার রাগের মুখে থামল ঊর্মিলা। কিন্তু গজগজানি কমল না।
কিছুক্ষণ আগে রাস্তার মোড়ে বাজারে বিশুর চায়ের দোকানের ঠেকে রবিবারের আড্ডা দিতে গিয়েছিল দীপু। অচেনা ধুতি পাঞ্জাবি পরা বয়স্ক ভদ্রলোক ওর বাবার নাম ধরে খোঁজ করছিলেন। বয়স সাতষট্টি আটষট্টির কম নয়, বেঁচে থাকলে দীপুর বাবারই বয়সি। দীপুর বাবা মারা গেছেন অনেক বছর হয়ে গেল। এতদিন পরে কেউ তার বাবার নাম ধরে খোঁজ করছে দেখে দীপু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, হরনাথ মণ্ডলকে খুঁজছেন? উনি কী হয় আপনার?
-উনি আমার অনেককালের পুরনো চেনা। উনি কি এই গ্রামেই থাকেন তো?
-থাকতেন। কিন্তু উনি তো বেঁচে নেই।’ বলল দীপু।
-উনি বেঁচে নেই?’ খুবই চিন্তিত দেখায় ভদ্রলোককে, যেন অথৈ জলে পড়েছেন। আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তা ওনার স্ত্রী কিংবা ছেলেরা কেউ কি এখানে থাকেন?
দীপু তখনও বলেনি সে হরনাথ মণ্ডলের ছেলে। জিজ্ঞেস করল, তা আছে, কিন্তু আপনাকে তো এখানে আগে কোনওদিন দেখিনি।

-না বাবা, আমি অনেকবছর আগে এসেছিলাম এখানে। তা তুমি চেনো নাকি ওনাদের?’ যেন খড়কুটো পেয়েছেন হাতের নাগালে।
এবার দীপু বলল, আমি হরনাথ মণ্ডলের ছেলে।
-ও তাই নাকি বাবা? দেখ, ভগবান ঠিক আছে। নাহলে একেবারে তোমার খোঁজ পেয়ে গেলাম।’ এবার নিজের পরিচয় দেন ভদ্রলোকও, ‘আমি তোমার বড় মামা বিশ্বেশ্বরের বন্ধু ছিলাম। বাংলাদেশে তোমার মামার বাড়ি আর আমার বাড়ি এক গ্রামে। তোমার মা মনে হয় চিনতে পারবে।
দীপুর বিশ্বাস হল, বাবা আর বড় মামার নামে যখন ভুল নেই, তাহলে ভদ্রলোক ঠিকই বলছেন। তাছাড়া একজন বয়স্ক মানুষকে এত অবিশ্বাসের কী আছে? নিশ্চয় কোনও সমস্যায় পড়ে খোঁজ করতে এসেছেন। লজ্জা পেল সে, ‘না, মানে আপনাকে দেখিনি আর আপনার কথা তো শুনিওনি কোনওদিন, তাই চিনতে পারলাম না। কিছু মনে করবেন না। চলুন আমার সঙ্গে।
হেঁটে আসতে আসতে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমারে তুমি দেখ নাই কারণ আমি একবারই তোমাদের বাড়িতে এসেছিলাম, তখনও তোমার জন্ম হয় নাই। তাছাড়া আমি তো আর এই দেশে ছিলাম না। তোমার মামা বাড়ির সবাই এই দেশে চলে এসেছিল ঠিকই কিন্তু আমরা আর আসি নাই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তোমার মামারা, আমরা সবাই এই দেশে এসেছিলাম। এক জায়গাতেই আমরা ছিলাম। তারপর যুদ্ধ থেমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা সবাই ফিরে গিয়েছিলাম। তোমার মামারা সবাই যায় নাই। অর্ধেক পরিবার থেকে গিয়েছিল। তোমার দাদু দিদিমা দেশে ফিরলেও তোমার মা মামারা সবাই থেকে গিয়েছিল তোমার ছোট দাদুর পরিবারের সঙ্গে। পরে তোমার দাদু দিদিমাও আবার এই দেশে চলে আসে। আমার আর আসা হয় নাই। তাই দেখ নাই কখনও।
দীপুর মনে পড়ল, এরকম কিছু গল্প সে শুনেছে মামার মুখেই। যদিও এই ভদ্রলোকের কথা কখনও শোনেনি। অন্তত তেমন কিছু মনে পড়ছে না। জিজ্ঞেস করল, এখন কি আপনি বাংলাদেশ থেকেই আসছেন?
-তা এক রকম বলতে পারো। তবে সোজা বাংলাদেশ থেকে নয়। মাসখানেক আগে এসেছি কলকাতায়। আমার স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে। আমরা তো এদেশে পাকাপাকিভাবে আসি নাই। কিন্তু কলকাতায় আমাদের কিছু আত্মীয়স্বজন আছে। আমার ছেলেমেয়েরা বিদেশে। মাঝে মাঝে ওই চিকিৎসার প্রয়োজনেই আসি। আবার ফিরে যাই। এই দেশে এলে পুরানো লোকজন খুব খুঁজতে ইচ্ছা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো ছিলাম এক ক্যাম্পে। তারপর আমরা ফিরে গেলেও কত চেনা মানুষ ফেরে নাই। কিন্তু কে কোথায় আছে জানি না। দেশে ফেরার আগে একবার এসেছিলাম তোমাদের বাড়িতে। তাই তোমাদের খোঁজে চলে এলাম। যদি আর কারও খোঁজ পাই। অবশ্য জানতাম না তোমার বাবা মার গেছেন। তা তোমার মা কেমন আছেন?
-ভালো নেই মামা। অনেক বছর হল মা পুরোপুরি বিছানা ধরা। অনেক চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু কিছুতেই ভালো হয়নি।
শুনে ভদ্রলোক একটুক্ষণ চুপ করে গেলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা কত বছর আগে গত হয়েছেন।
-তা প্রায় কুড়ি বছর।
-তোমার মা কি তারপর থেকেই অসুস্থ, না পরে হয়েছে?
-না, তা ঠিক নয়। ভিতরে ভিতরে কিছু হচিছল কিনা আমরা জানতাম না। বছর দশেক আগে একবার স্ট্রোক হয়। তারপর থেকে কেমন যেন হয়ে যায়। আমরা চিকিৎসা করাই, কিন্তু মা আস্তে আস্তে বিছানা ধরা হয়ে যায়। এখন তো নিজে উঠতেও পারে না।
ভদ্রলোক মনে মনে হিসেব করেন, তারপর বলেন, তোমার মায়ের তো তেষট্টি চৌষট্টি বছর বয়স হল, তাই না?
-হ্যাঁ ওইরকমই হবে।
-এই বয়সেই একেবারে বিছানা ধরা? সবাইকে চিনতে পারে?
-তা পারে। তবে খুব একটা সাড়া দেয় না। নাতি নাতনিরা কাছ গেলেও কোনও বিকার নেই। তাই আমার ছেলেমেয়েরাও খুব একটা কাছে যায় না।
-তোমরা কয় ভাইবোন?
-আমরা দুই ভাই, ছোট কলকাতায় চাকরি করে। তার পরিবার নিয়ে ওখানেই থাকে।
ভদ্রলোককে কেমন বিমর্ষ দেখায়, এতকাল পরে তোমাদের খোঁজ করতে এসে এইসব খবর শুনব ভাবতে পারি নাই। আমি তো একমাত্র তোমার মাকেই চিনতাম। আর তোমার বাবা বেঁচে থাকলে পরিচয়ে বুঝতে পারতেন। কিন্তু এখন হয়তো তোমার মাও আমাকে চিনতে পারবে না।
-এতবছর আগের কথা বলছেন, তা মুখ দেখে না চিনতেও পারে। তবে নাম পরিচয়ে নিশ্চয় চিনবে। আপনিও হয়তো মাকে দেখলে চিনতে পারবেন না।
-তোমার মাও যদি চিনতে না পারে তাইলে তো আমার আসাটাই বৃথা। এতবছর পর চেনা মানুষ খুঁজতে এসেও ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হবে। এতকাল যখন আসি নাই, আর না এলেই ভালো হতো। ভদ্রলোকের গলায় হতাশার সুর।
গল্প করতে করতেই ভদ্রলোককে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল দীপু।

  • * *
    সাতচল্লিশ বছর আগে স্টেশন থেকে মাইল চারেক পথ হেঁটেই এসেছিলেন নিশিকান্ত। তখন তাছাড়া বিশেষ কোনও ব্যবস্থা ছিল না। খানিকটা পাকা রাস্তা, তারপর ধুলো ওড়ানো কাঁচা মাটির পথ। পাকা রাস্তাটুকুতে বাস ছিল। সে হাতেগোনা। সময়ের ঠিকানা নেই। তাই হেঁটেই এসেছিলেন পুরো পথ। আজ স্টেশন থেকেই একটা টোটো তাঁকে পৌঁছে দিল গ্রামের বাজারে। পুরোটাই পাকা রাস্তা। এই বাজারটা তখনও ছিল গুটি কয় দোকানপাট নিয়ে। তবে সেদিনের বাজারটুকুর সঙ্গে আজকের অনেক তফাৎ। সেদিন ছিল দু’চারটে মুদিখানা, চায়ের দোকান, টেলারিং শপ। একজন হাতুড়ে ডাক্তারও বোধহয় ছিল। আর বিকেল হলে সবজি, মাছ নিয়ে বসত অনেকে। ছিন্নমূল মানুষদের বাজার। চোখে ভাসছে নিশিকান্তর। আজ অনেক দোকানপাট। এবং তা বেশ আধুনিক মানেরই। মোবাইল, ইন্টারনেটের দোকানদানিও শোভা পাচ্ছে। আছে টিভি ফ্রিজের মেকানিকও। কত বদলেছে জায়গাটা। বছর সাতচল্লিশ আগে দেখা জায়গাটা যেন চিনতেই পারছেন না নিশিকান্ত।
    বেলা বাড়ছে। বাজারের দোকানপাটগুলো বেশিরভাগই খোলা। স্মৃতিপটে যেটুকু লেখা আছে তাতে তাঁর নির্দিষ্ট গন্তব্য এখান থেকেও বেশ খানিকটা ভিতরে। কিন্তু বাজারের মতোই বাড়িঘর পথঘাটের চেহারাও বদলে গেছে। সাতচল্লিশ বছর আগে যেখানে একটাও পাকাবাড়ি দেখেননি নিশিকান্ত, সেখানে এখন কাঁচা বাড়ি প্রায় নেই। সেদিনের মাটির আঁকাবাঁকা পথ এখন ঢালাই দেওয়া। অতএব না চেনারই কথা।
    সাতচল্লিশ বছর আগে যে গ্রামটা দেখে গিয়েছিলেন নিশিকান্ত, সেই গ্রামটার সঙ্গে তাঁর নিজের গ্রামের কিছু মিল ছিল। সেই নারকেল, সুপারি, আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা গাছের ফাঁকে বেড়ায় ঘেরা এক একটা বাড়ি, মাটির দেওয়াল, খড় কিংবা টিনের চালা। পরিষ্কার নিকোনো উঠোন, উনুন জ্বালানোর কাঠকুটো আর নারকেল পাতার স্তূপ, খড়ের পালুই, গোয়াল সব যেন মিলেমিশে একাকার ছিল তখন। ওপার এপারের কোনও ফারাক ছিল না। আজ সেসব কিছুরই যেন অস্তিত্ব নেই। শুধু তিনটে নাম মনে আছে, একটা গ্রাম আর দু’টো মানুষ। তারই ভরসায় এতদূর আসা। তারা আদৌ আর এখানে কেউ থাকে কিনা, তাও তো জানা ছিল না। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলে খোঁজ পেয়ে গেছেন। নিশিকান্ত জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ভাবছিলেন।
    নিশিকান্ত আর বিশ্বেশ্বর যেন হরিহর আত্মা। পাশাপাশি নয়, একটু দূরেই দু’টো বাড়ি। তবু বিশ্বেশ্বরদের বাড়িটা যেমন নিশিকান্তর আপন ঘর, তেমনি নিশিকান্তদের বাড়িও বিশ্বেশ্বরের কাছে তাই। আত্মীয়তার সম্পর্ক কিছু একটা আছে, সে লতায় পাতয় জড়ানো, যাকে বলে জ্ঞাতি সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক নিয়ে কোনওদিন ওদের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। সমবয়সির বন্ধুত্বটাই ছিল বড়। ওরা দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটাত একসঙ্গে। ছোটবেলায় দীনু মাস্টারের পাঠশালা, তারপর হা‌ই স্কুল, সব একসঙ্গে। স্কুল থেকে ফিরে একসঙ্গে খেলাধুলা। ছুটির দিনে ঝোপজঙ্গল আর মাঠময় ঘুরে বেড়ানো। রাতেও খাওয়ার পর একবার দু’জনের দেখা না হলে যে ঘুম আসবে না, তাই বিশ্বেশ্বরদের বাড়ির উঠোনে তাদের দিনের শেষ আড্ডা। ওদের বাড়ির উঠোনে একটা পুরনো পেয়ারা গাছ ছিল। যে গাছটার ঠিক নীচেই ছিল একটা বাঁশের চালির মাচা। যে মাচাটাই ছিল তাদের রাতের আড্ডাস্থল। কখনও কখনও সন্ধ্যা রাতেও বাড়ির সব ভাইবোন মিলে গল্পের আসর বসত সেই মাচায়। সে আসরের মধ্যমণি ছিলেন আশু খুড়ো। লেখাপড়া না জানা আশু খুড়ো যেন পৃথিবীর সব রূপকথার গল্প জানতেন। সেই সব রূপকথার গল্প দিয়ে ওদের মোহিত করে রাখতেন। তার অসাধারণ বলার ভঙ্গিতে মনে হত ওরাই সেই রূপকথার নায়ক।
    বিশ্বেশ্বরের পিঠোপিঠি তিন ভাইবোনের ছোট কমলিনী। খুব আদুরে। কটা বাড়ির উঠোন পেরিয়ে নিশিকান্তদের বাড়ি। সে বাড়িতেও কমলিনীর আসা যাওয়া ছিল যখনতখন। ছোট্ট বেলার জামা ছেড়ে যখন সে শাড়ি ধরল তখন তাকে পাকাবুড়ি বলত নিশিকান্ত। ঠাকুমার মতো পাকা পাকা কথা বলত বলে কখনও কখনও বলত ‘বুড়ি ঠাউরমা।’ সব সময় তার মুখে যেন কথার খই ফুটত। সবকথার পিঠে জুৎসই কথাটা যেন জুগিয়ে দিত কেউ। দুই ছেলের পর ছোট মেয়ে বলে বাড়ির সবার কাছে কমলিনীর আদর ছিল সবচেয়ে বেশি। কমলিনীর জন্য সেই একই স্নেহসুধা ঝরে পড়ত নিশিকান্তর অন্তর থেকেও। আর বিশ্বেশ্বরের মতো নিশিকান্তও যেন ছোট্ট কমলিনীর আর এক বড়দা।
    এমনি করে সময় গড়িয়ে একসঙ্গে ওরা বড় হয়ে উঠল। স্কুল শেষ করে বিশ্বেশ্বর চলে গেল সদরের কলেজে পড়তে। কিন্তু এমনই সময় পিতৃবিয়োগ হওয়ায় নিশিকান্তর আর উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া হল না। বাড়ির জমিজমা দেখাশোনার ভার নিতে হল তাকে। কারণ সেসবই ছিল তাদের পারিবারিক আয়ের একমাত্র উৎস।
    বিশ্বেশ্বর চলে গেল বটে কিন্তু তাদের বাড়িতে আসা যাওয়ায় ছেদ পড়ল না নিশিকান্তর। বরং এবাড়ির সবার কাছে সে ছিল আর এক বিশ্বেশ্বর। তার অনুপস্থিতিতে শূন্যস্থান পুরণ করার ভার নিশিকান্তর। এবাড়ির কাজে কর্মে সবসময় ডাক পড়ত নিশিকান্তর। এই বয়সেই পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষায় তার আগ্রহ যেন এবাড়ির সবার কাছে তাকে বাড়তি কদর দিল। সবাই বুঝল নিশিকান্ত বিষয় সম্পত্তি বুঝতে পারবে, ধরেও রাখতে পারবে। অতএব বিশ্বেশ্বরদের বাবা কাকার যৌথ পরিবারে নিশিকান্ত বাড়তি গুরুত্ব পেল।
    ঠিক এমন সময়ই মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠায় উত্তাল হল গোটা পূর্ব পাকিস্তান। কলেজের পড়া ছেড়ে বিশ্বেশ্বর ফিরে এল গ্রামে। ভিটেমাটি, দেশ ছেড়ে দলে দলে মানুষ রাতের অন্ধকারে পাড়ি দিচ্ছে ইন্ডিয়ায়। খান সেনা আর রাজাকারের অত্যাচারে তখন হিন্দুদের বেঁচে থাকা দায় হয়ে উঠল। বিশ্বেশ্বরের বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন দেশ ছাড়বেন। আর তা শুনে নিশিকান্তও সিদ্ধান্ত নিল মা ভাইবোনদের নিয়ে ওদের সঙ্গে চলে আসবে ইন্ডিয়ায়। বিধবা মা আসতে চাইছিল না। কিন্তু যখন শুনল বিশ্বেশ্বররাও সবাই চলে যাবে তখন আর না করল না। এক রাতে ওরাও সবাই সেই দেশত্যাগীদের দলে নাম লেখাল। ওদের পুরো পরিবার রাতের অন্ধকারে চলে এল এপারে। রিলিফ ক্যাম্পে ঠাঁই দিয়েছিল এদেশের সরকার।
    তখন কত আর বয়স নিশিকান্ত, বিশ্বেশ্বরের? বছর কুড়ি হবে। আরও অনেকের সঙ্গে এই দু’টো পরিবারও ছিল একসঙ্গে। সে সব দিনের কথা মনে পড়লে আজও চোখে জল আসে নিশিকান্তর। কুকুর, বিড়াল, ছাগল, গোরুর মতো কী দুর্বিষহ দিনযাপন করতে হয়েছে তখন। সেই ক্যাম্পে থাকতে থাকতেই ওরা খুঁজে বেড়াত দেশ ভাগের পর পর আসা আত্মীয়স্বজন চেনাজানাদের। কাউকে খুঁজে পেয়েছে, কাউকে পায়নি।
    অস্থায়ী সেই ক্যাম্পে থাকতে থাকতে কোনও এক আত্মীয়ের যোগাযোগের সূত্রে কমলিনীর বিয়ে ঠিক করেছিলেন বিশ্বেশ্বরের বাবা। বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস ছিল না ওদের কারও, তবুও কমলিনী আপত্তি করেছিল। মনে পড়ে নিশিকান্তর, কমলিনী বলেছিল, আমিও তোমাদের সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে চাই। আমাকে নিয়ে চলো তোমাদের সঙ্গে। কিন্তু মানেননি তার বাবা। বলেছিলেন, আমরাও আবার ফিরে আসব এইখানে। তাই তোর বিয়ে এইখানেই দিয়ে যাব। হঠাৎ কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা জানা নেই নিশিকান্তর। হয়তো ক্যাম্পে থাকতে থাকতেই তিনি ঠিক করেছিলেন, আর ওদেশে থাকবেন না। যুদ্ধ থামলে দেশে ফিরলেও ধীরে ধীরে জমিজমা বেচে দিয়ে এদেশে পাকাপাকিভাবে চলে আসবেন। অতএব এদেশেই মেয়েকে পাত্রস্থ করতে চান। তাই সেই আত্মীয়র বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন কমলিনীর। তার আর দেশে ফিরে যাওয়া হয়নি। শুধু কমলিনী নয়, এখানেই রেখে গিয়েছিলেন ভাইয়ের পুরো পরিবার আর নিজের দুই ছেলেকেও। বিশ্বেশ্বর এদেশেই একটা কলেজে ভরতি হয়ে গিয়েছিল দু’বছরের ক্ষতি স্বীকার করে। দেশে ফিরেছিলেন শুধু বিশ্বেশ্বরের বাবা আর মা।
    সেদিন নিশিকান্তও চেয়েছিলেন এদেশে থেকে যেতে। কিন্তু তার মা কিছুতেই থাকতে চায়নি। তাই মা আর ভাইবোনদের নিয়ে আরও সবার সঙ্গে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন নিশিকান্ত। ফিরে যাওয়ার বছর খানেকের মধ্যেই বিশ্বেশ্বরের বাবা মা ছেলেমেয়েদের দেখতে আসার কথা বলে একদিন চলে আসেন। আসার আগে নিশিকান্তকে বলেছিলেন, নিশিকান্ত, আমাদের বাড়িঘর একটু খেয়াল রেখো। মাসখানেকের মধ্যে আমরা আবার ফিরে আসব। কিন্তু মাসের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা আর দেশে ফেরেননি।
    তারপর থেকেই বিশ্বেশ্বরের পরিবারের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল নিশিকান্তর। বিশ্বেশ্বররা এখন কোথায় থাকে তাও তিনি জানেন না। বিশ্বেশ্বর তার স্থায়ী ঠিকানা জানিয়ে কোনওদিন চিঠিও দেয়নি নিশিকান্তকে। অনেকদিন তাদের সেই সম্পত্তি রক্ষা করতে পেরেছিলেন নিশিকান্ত। পরে সে সব মালিকানাহীন বলে বেদখল হয়ে যায়। নিশিকান্ত চেয়েছিলেন সেই সম্পত্তির কথা জানাতে। কিন্তু পারেননি। কোথায় কাকে জানাবেন? বিশ্বেশ্বরও যে এভাবে তাকে ভুলে যাবে তা তিনি ভাবতে পারেননি। কেন সে আর মনে রাখতে চায়নি তাও তিনি জানেন না। নিশিকান্ত ভুলে যাননি কিছুই। তাই আজ এই বয়সে এসে আরও বেশি করে খুঁজতে ইচ্ছে করে সেদিনের প্রিয় মানুষগুলোকে। বার্ধক্যের অবসর যে মানুষকে শৈশবে ফিরিয়ে দেয়। সেইসব দিন না থাকলেও তার ছায়া প্রলম্বিত হয়। কিন্তু কাকে কোথায় খুঁজে পাবেন? বিশ্বেশ্বরের ঠিকানা জানা নেই। শুধু জানার মধ্যে ছিল কমলিনী আর তার গ্রামের নামটা। মনের গভীরে পুরু ধুলোর আস্তরণের নীচে চাপা পড়ে ছিল সেই নাম। আজ এত বছর পরে সেই ধুলো ঝেড়ে সেখানেই এসে হাজির হলেন নিশিকান্ত। কমলিনী কি চিনতে পারবে তাঁকে? না কি সেও আর মনে রাখেনি নিশিদার কথা? যেমন ভুলেছে বিশ্বশ্বরও।
    নিশিকান্তর মনে পড়ল, রিলিফ ক্যাম্পের অস্থায়ী পাট তুলে দেশে ফিরে যাওয়ার আগে বিশ্বেশ্বরদের সঙ্গে এসেছিলেন এখানে। কমলিনীর শ্বশুরবাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে। তার শ্বশুরবাড়িতে সাধ্যমতো আপ্যায়ন করেছিল। কিন্তু তারা ফেরার সময় কমলিনী খুব কেঁদেছিল। সে কান্না দেখে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি নিশিকান্ত। আড়ালে সরে গিয়ে চোখ মুছেছিলেন আর বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস চেপে ফিরে গিয়েছিলেন আপন জন্মভূমিতে। আজ এত বছর পরে সেদিনের সেই ছবিটাও যেন আরও একবার তাঁর চোখের ওপর দিয়ে ভেসে গেল।
  • * *
    দীপুর সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে ঊর্মিলাও। দীপু জানে, যতই অচেনা হোক, ঊর্মি যতই ফুঁসে উঠুক, ভদ্রলোককে এত বেলায় আপ্যায়ন না করে বিদায় করতে পারবে না। দু’জনেই নিশিকান্তকে প্রণাম করে।
    নিশিকান্ত বলেন, থাক মা। এই অসময়ে এসে তোমাদের খুব অসুবিধায় ফেললাম।
    এই রে, ঊর্মির কথাগুলো হয়তো উনি শুনতে পেয়েছেন, তাই একথা বলছেন। লজ্জা পেল দীপু, না না অসুবিধার কী আছে। আপনি বয়স্ক মানুষ। এত বছর পরেও খোঁজ করে এসেছেন। এতো আমাদের সৌভাগ্য।
    নিশিকান্ত বলেন, তোমরা আমাকে চেনো না, দেখনি কোনওদিন। কোনও সম্পর্কও নেই তোমাদের সঙ্গে। তবু যে আমাকে তোমরা আপন করে নিলে এতে আমি খুব খুশি। আজকাল তো এসব ভাবাই যায় না। অচেনা মানুষকে এইভাবে কেউ ঘরে আনার কথা ভাবতেই পারে না। আমি অবশ্য তাতে কোনও দোষ দেখি না। বরং সেটাই স্বাভাবিক। আর আমি তেমন কোনও প্রত্যাশা করেও বেরোইনি। উদ্দেশ্যহীনভাবেই বেরিয়েছিলাম। কারও খোঁজ পেল ভালো, না হলে এমনিই ফিরে যেতাম। কয়েকদিন পরেই তো দেশে ফিরে যাব।
    ঊর্মি মনে মনে বলে, আদিখ্যেতা। একটা অচেনা বাড়িতে এসে আবার কত বিনয় দেখাচ্ছে। নেহাত বুড়ো মানুষ, কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের জার্নি করে এসেছ, তাই বসতে বললাম। না হলে কে বাড়িতে ঢুকতে দিত। আজকাল কত বায়নাক্কা করে বাড়িতে ঢুকে সব সাফ করে দিয়ে যায়। বুড়ো বলে তাতেও ভরসা নেই। ওসব দলে মেয়ে বুড়ো সব থাকে। তবু এটুকু বিশ্বাস করছি এতসব আত্মীয়স্বজনের কথা বলায়। আমি না হয় সবাইকে চিনি না, কিন্তু ও তো ওই সব মানুষদের কথা শুনেছে। আর বিয়ে হয়ে এসে এসব গল্প আমিও কিছু কিছু শুনেছি তাই। এবার সে হাসিমুখে বলে, না না মামা, ওভাবে বলবেন না। আপনি এই বয়সেও পুরনো চেনা মানুষজন খুঁজতে বেরিয়েছেন, আমরা তো এসব ভাবতেই পারব না।
    -হ্যাঁ, বয়সটা অবশ্য একটা সমস্যা। না হলে আমি মনে মনে কত জায়গা ঘুরে বেড়াই জানো। কতবার ভেবেছি তোমাদের এখানে আসব। সেই কবে দেশে ফিরে যাওয়ার আগে এসেছিলাম দেখা করতে। তারপর তো আর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তবু মন থেকে মুছে যায়নি কিছুই। গত কয়েকবছরে অনেকবার এদেশে এসেছি। কিন্তু মন চাইলেও কোথাও যাওয়া হয়নি। আসলে চেনা মানুষগুলো কে কোথায় তাওতো জানি না। তোমাদের এখানেও আসিনি। এখন মনে হচ্ছে আগে এলে হয়তো তোমার মাকে সুস্থই দেখতে পেতাম। এই আফশোসটা মিটবে না। তা তোমার মা কি ঘুমাচ্ছে?
    দীপু বলল, না না, মা জেগেই আছে। তবে ওই যে বললাম, মা জেগে থাকলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায় না।
    -চলো তাহলে একবার দেখা করে আসি। দেখি চিনতে পারে কিনা।
    -হ্যাঁ চলুন।
    অনাহূতের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে ঊর্মিলা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। দীপু নিশিকান্তকে নিয়ে এল মায়ের ঘরে। ঘরের একধারে জানালার কাছে একটা ছোট খাটে কাত হয়ে বাইরের দিকে মুখ করে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। মাথায় কাঁচাপাকায় মেশানো পাতলা চুল। ফ্যানের হালকা হাওয়ায় এলোমেলো উড়ছে। পরনে কালো ফুল ছাপ সাদা শাড়ি। নিশিকান্ত দেখার চেষ্টা করলেন সাতচল্লিশ বছর আগে শেষবারের মতো দেখে যাওয়া কমলিনীকে। কিন্তু পিছন থেকে যেন ঠিক বুঝতে পারলেন না। দীপু ডাকল, মা দেখ, তোমাকে কে দেখতে এসেছেন।
    প্রথম ডাকে কোনও সাড়া পেল না ওরা। নিশিকান্ত বললেন, ঘুমাচ্ছে মনে হয়।
    দীপু আবার ডাকল, ও মা, দেখ কে এসেছেন।
    এবার তার মা মুখ ফেরালেন। দীপুর পাশ দিয়ে নিশিকান্তর মুখের ওপর তাঁর দৃষ্টিটা আটকে গেল। যেন মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন, কে এই অনাহূত।
    নিশিকান্ত দেখলেন এক বৃদ্ধাকে। বয়স যতটা না, তার চেয়ে বোধহয় একটু বেশিই বয়স্ক দেখাচ্ছে তাঁকে। ষোড়শ বর্ষীয়া যে কমলিনীকে তিনি শেষবার দেখে গেছেন সে এখন ষাটোত্তীর্ণা। কিন্তু অসুস্থতায় যেন শরীরে আরও বেশি বয়সের ছাপ। শুধু মুখের অস্পষ্ট আদলটুকু ছাড়া যেন আর কোনও মিল নেই। একদা উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রংয়েও এখন বার্ধক্যের ছাপ। ঘন কালো লম্বা চুলের গোছা এখন যৎসামান্য টিকে আছে। একটা মানুষকে প্রতিদিন দেখতে দেখতে তার পরিবর্তন কখনও চোখে পড়ে না। কিন্তু সাতচল্লিশ বছর পরে সেই পরিবর্তনটাই প্রকট। পুরনো মানুষটাকে যে খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। তবু নিশিকান্ত এই মুখটার ওপর দেখলেন ষোড়শী সেই কমলিনীর মুখের ছায়া, যে কমলিনীকে একবার দেখার বাসনায় আজ শেষ বয়সে একটা দেশের বেড়া ডিঙিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এসেছেন।
    এতকাল পরে কমলিনী কি তাকে চিনতে পারছে? মনে রেখেছে তার কথা? নিশিকান্তকে চোখের সামনে দেখে কমলিনীর কি কিছু মনে পড়ছে? একবারও মনে পড়ছে ছোট্টবেলার সেই গোলাবুড়ি খেলা, শীতের দুপুরে মাঠময় ছুটে লেজওয়ালা ঘুড়ি ওড়ানোর দিনগুলো, কিংবা জ্যোৎস্না রাতে উঠোনের বাঁশের মাচায় বসে রূপকথার গল্প শোনার কথা? বাগানের পেয়ারা গাছের মগডাল থেকে সবচেয়ে ভালো পেয়ারাটা পেড়ে দেওয়ার দিন কিংবা পুকুরের জলে নেমে হেলেঞ্চা শাক, শাপলা তুলে আনা, গামছা দিয়ে মাছ ধরার দিনের কথা? গ্রীষ্মের দুপুরে নদীর জলে ঝাঁপানো কিংবা বিকেলে দল বেঁধে ডিঙি নৌকা নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে পড়ছে না? নৌকা বাইচে বিশ্বেশ্বর নিশিকান্তর প্রথম হওয়ার পর বিশ্ববিজয়ের আনন্দে লাফিয়ে ওঠার দৃশ্যটা কি একবারও কমলিনীর চোখের ওপর ভাসছে না? আর তারপর, তারও পর একটু একটু করে দু’জনের মনের মধ্যে একটা রঙিন ছবি এঁকে নেওয়ার কথা, দু’টো হৃদয়ের কাছাকাছি আসার কথা, সবার অলক্ষ্যে সন্ধ্যার বালি বালি জ্যোৎস্নায় পেয়ারা বাগানে গাছের আড়ালে প্রথম ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ানোর কথা কি একটুও মনে পড়ছে না কমলিনীর? দেশান্তরের রিলিফ ক্যাম্পে তার বিয়ের কথা ওঠার পর লুকিয়ে নিশিকান্তর কান্নার কথা কি মনে আছে কমলিনীর? মনে পড়ে, নিশিকান্ত তখন তাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল? কিন্তু একটা অচেনা দেশে কোথায় যাবে, কী করবে, কীভাবে বাঁচবে সেই ভয়ে কমলিনী বলেছিল, যেভাবেই হোক আমিও দেশে ফিরব। কেউ মানুক না মানুক দেশে গিয়ে আমরা সংসার পাতব। না, সেই ফেরাটা হয়নি কমলিনীর। এপারে আর একজনের সঙ্গে কমলিনীর পাতা সংসার দেখে একা ফিরেছিল নিশিকান্ত। তারপর প্রকৃতির নিয়মে সময় গড়িয়েছে তার মতো করে। চোখের জল একসময় শুকিয়ে গিয়েছে। মুছে গিয়েছে শোক। নতুন ছন্দে উদ্বেল হয়েছে তাঁর জীবনও। কিন্তু সেই ক্ষতের দাগটা যে মুছে যায়নি, যা এত বছর পরেও জীবন সায়াহ্নে এসে নিশিকান্তর হৃৎপিণ্ডটাকে নাড়া দেয়। ইহলোক ছেড়ে যাওয়ার আগে কমলিনীকে অন্তত একবার চোখে দেখে যাওয়ার বাসনা জাগায়। একান্ত নিরালায় অনেক স্মৃতি ভেসে আসে মানস পটে।
    কমলিনী নির্বাক তাকিয়ে আছেন নিশিকান্তর মুখের দিকে। নিঃশব্দে যেন কিছু খুঁজে ফিরছেন। নিশিকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে চিনতে পারছ কমলি?
    অনেকক্ষণ নিশিকান্তর মুখের দিকে একভাবে নীরবে তাকিয়ে রইলেন দীপুর মা। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর মুখের ওপর যেন হারানো প্রাপ্তির খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ল। বহু বহু বছর পর কমলি ডাকটা যেন অনুরণীত হয়ে তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে গেল। ছোটবেলায় বাড়িতে এটাই ছিল তার ডাকনাম। নিশিদাও ডাকত সেই নামে। এতকাল পরে আবার সেই নামটা তাকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছোটবেলার খেলার মাঠে, শিশির ভেজা শিউলি তলায়, নদীর কুলে, পেয়ারাবাগানে। পরে সবার অলক্ষ্যে নিশিদা আরও ছোট করে বলত ‘কলি। ফুলের কলি।’
    নিশিকান্ত আবার জিজ্ঞেস করলেন, কি একটুও চেনা লাগছে?
    দীপু অবাক হয়ে দেখল, তার মা এবার হাসল। এই হাসিটা তার মা কবে থেকে যেন হারিয়ে ফেলেছিল। ছোটবেলা থেকেই মাকে খুব একটা কোনওদিন প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি দীপু। অনেক বড় হয়েও দীপু তার মায়ের মুখে অদ্ভূত এক যন্ত্রণার ছবি দেখেছে, যার ব্যাখ্যা ঩সে কোনওদিন পায়নি। কেউ বলত দেশে ফিরে না যেতে পারার শোক, তারও পরে কেউ বলত বাবা মায়ের মৃত্যু শোক। আস্তে আস্তে সবকিছু সামলে উঠলেও মায়ের মুখে প্রাণখোলা হাসি কোনওদিন দেখতে পায়নি। মা তার সংসার সামলেছে। ছেলেদের মানুষ করেছে। তাদের বিয়ে দিয়েছে, নাতি নাতনি হয়েছে। কিন্তু মায়ের মুখের সেই হাসিটা যেন কোনওদিন ফেরেনি। আজ মায়ের মুখে এই আলতো হাসিটুকু দেখে দীপুর বুকের ভেতরও যেন অনন্ত খুশির তুফান উঠল। বলল, মা আপনাকে চিনতে পেরেছে।

নিশিকান্ত বললেন, হ্যাঁ, তোমার মা মনে হয় চিনেছে আমাকে। কি চিনেছ তো কমলি? আবার হাসলেন কমলিনী। এবার হাসির রেখা টা যেন আরও একটু স্পষ্ট। দীপু বলল, আপনি কথা বলুন মামা। একটু আপনাদের দেশের কথা বলুন তাহলে মা খুশি হবে।
নিশিকান্ত বললেন,কমলি কথা বলো। আমাকে চিনতে পারছ তো? দীপু বলল, মা তো কথা বলতে পারে না মামা।
আকাশটা মাটিতে নেমে এলেও বোধহয় এর চেয়ে কম অবাক হতেন নিশিকান্ত। চেনা পথে হঠাৎ যেন হোঁচট খেলেন, এ পথে যে কোথাও ভাঙা পাথর পড়ে আছে তা জানতেন না। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কথা বলতে পারে না? কি বলো তুমি বাবা। কবে থেকে তোমার মা কথা বলতে পারে না?
-‘আমি তো মাকে কোনওদিন কথা বলতে শুনিনি। শুনেছি আমার জন্মের আগে থেকেই মা কথা বলতে পারে না। বাবা ঠাকুমার কাছে শোনা, এমনিতে মা খুব কম কথা বলত। মা আর বাবার বিয়ের কিছুদিনের মাথায় দাদু দিদিমারা যখন দেশে ফিরে যায় সেসময় একদিন বড়মামারা দেখা করতে এসেছিল। সেদিন মা নাকি খুব কান্নাকাটি করেছিল। ওরা সবাই ফিরে যাওয়ার পর কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎই কথা বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তার নাকি বলেছিল, মারাত্মক কোনও শক পেয়ে মায়ের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। তখন বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। তাই বাবা সে সময় মায়ের তেমন চিকিৎসা করাতে পারেনি। অবশ্য ডাক্তার নাকি বলেছিল পরে আবার কখনও মায়ের কথা ফিরতে পারে। কিন্তু মা আর কোনদিন কথা বলেনি।’
নিশিকান্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন কমলিনী দিকে। নির্বাক, নিষ্পলক। যে কমলিনী অনেক কথা বলতো, কথাযই ছিল যার প্রাণ,সে আজ কথা বলে না। কেন? কমলিনী বলেছিল, তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে কোনওদিন ভালোবাসার কথা বলতে পারব না। তাই কি সে মুখের কথা হারিয়ে ফেলেছিল? এতকাল স্বেচ্ছায় অন্তহীন নীরবতা পালন করেছে কমলিনী?তাঁর চোখে চোখ রেখে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন নিশিকান্ত।
শেষ

 7,136 total views,  4 views today

Leave a Reply